নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারে ব্যর্থতায় আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছেন লর্ড এভেবারি ও লর্ড কার্লাইল
আইসিটি’র নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার জন্য আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি জানিয়েছেন লর্ড এরিক এভেবারি এবং লর্ড কার্লাইল। জেনেভাস্থ ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন ফর হিউম্যান রাইটস-এর হাই কমিশনার নাভী পিল্লাই বরাবর লিখিত এক চিঠিতে তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এদিকে বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বৃটেনের আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান। ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা সুবিচার পাননি বলেও দাবি করেছেন তিনি। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এ গত শুক্রবার “ইৎরঃরংয ষধুিবৎং পৎরঃরপরংব ইধহমষধফবংযর ধিৎ পৎরসবং ঃৎরনঁহধষ ” শীর্ষক প্রতিবেদনে এ দাবি জানানো হয়।
লন্ডন থেকে কাওছার জানান, আইসিটি’র নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার জন্য আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি জানিয়ছেন লর্ড এরিক এভেবারি এবং লর্ড কার্লাইল। জেনেভাস্থ ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন ফর হিউম্যান রাইটস-এর হাই কমিশনার নাভী পিল্লাই বরাবর লিখিত এক চিঠিতে তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
চিঠিতে তারা বলেন, যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সর্বদলীয় হিউম্যান রাইটস গ্রুপ-এর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। লর্ড কার্লাইল এবং লর্ড এরিক এভেবারি বলেন, বেশ কিছুকাল থেকেই আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন কার্যক্রমকে সমালোচনা করে বেসরকারি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিবৃতি আপনার দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকবে। একজন অভিযুক্তের মৃত্যুদ-াদেশ নিয়ে করা আপিলের কার্যক্রম শেষ হয়ে তা এখন রায়ের অপেক্ষায় আছে। এই প্রেক্ষাপটে আপনার উচিত হবে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি নিরপেক্ষ প্রতিনিধি দলকে পুরো বিচার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমন্ত্রণ পাঠানোর অনুরোধ জানানো। এই প্রতিনিধি দল ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে। কারাবন্দী বিচারাধীন ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানবে।
চিঠিতে তারা আরো বলেন, আমরা পুরোপুরি বিচার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করি। যারা অন্যায় করেছে দায়মুক্তির জন্য তাদের বিচার হওয়া জরুরিও বটে। তবে বিচার প্রক্রিয়ায় সরকারের দায়িত্ব হলো মানবাধিকার নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করা এবং নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান থেকে বিচ্যুতির অর্থ হলো কাক্সিক্ষত শান্তি, নিরাপত্তা এবং জাতির কল্যাণ অর্জন ব্যাহত হবে। নির্যাতিতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কেন্দ্রীয় লক্ষ্যও এতে অর্জিত হবে না।
২০১২ সালের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয় আন্তর্জাতিক আইনের সাথে এর অসঙ্গতি এবং মান বজায় না থাকার জন্য। যদিও কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল যেমন, দোষ প্রমাণের আগে অভিযুক্তকে নির্দোষ মনে করা, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এসব কেবলমাত্র তাত্ত্বিকতায়ই রয়ে গেছে। বাস্তবে যার প্রয়োগ হয়নি। পুরো বিচার প্রক্রিয়া ধরেই, যা শুরু হয়েছিল ২০১১ এ বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের অধিকার সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়ে আসছিল।
লর্ডগণ আরও বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে কতিপয় বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ নিয়ে বেশ কিছু চিঠি চালাচালি এবং জরুরি আপিল পেশ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন, ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড এন্ড ভলান্টারি ডিসএপিয়ারেন্স, স্পেশাল র্যাপোটিয়ার অন এক্সট্রা জুডিশিয়াল, সামারি এন্ড আরবিট্রারি এক্সেকিউশন, স্পেশাল র্যাপোটিয়ার অন দি ইনডিপেডেন্ট অব জাজেস এন্ড লয়ারস এবং স্পেশাল র্যাপোটিয়ার অন টরচার। ট্রাইব্যুনাল তার প্রথম রায় ঘোষণা করে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে। তিনি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ এ এক্সট্রা জুডিশিয়ালের ওপর বিশেষ দূত ক্রিস্টফ হেইনস এবং স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার অন ইনডিপেডেন্ট অব জাজেস এবং লয়ার্স গ্যাব্রিয়েলা ক্রাউল এক বিবৃতিতে বলেন, তারা আবুল কালাম আযাদের বিচার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারের অভাব দেখতে পেয়েছেন। মি হেইনস জোর দিয়ে বলেন, মৃত্যুদ-াদেশ কেবল তখনই দেয়া যায় যেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্তত পক্ষে আইসিসিপিআর এ যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের ন্যূনতম সেসব বিষয়গুলোও অনুসরণ করা উচিত ছিলো।
গ্যব্রিয়েলা ক্রাউল বিচারক, সরকারি কৌঁসুলিদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি ট্রাইব্যুনালের ওপর সরকারি প্রভাব নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেন।
লর্ড এভেবারি এবং লর্ড কার্লাইল আরও বলেন, আমরা দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে সরকার সাক্ষীদের যথাযথ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ৫ নবেম্বর ২০১২ এ অভিযুক্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে পুলিশ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে অপহরণ করে। কয়েকমাস পরে বালীকে কোলকাতার একটি জেলে বন্দী অবস্থায় পাওয়া যায়। ভারতের জেলে বন্দী থাকা অবস্থাতেই এক স্টেটমেন্টে বালী নিশ্চত করেন যে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই পুলিশের ভ্যানে তাকে অপহরণ করা হয়। তাকে ঢাকার একটি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় যা ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয় বলে তিনি জানতে পারেন। এই ঘটনা একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি রাখে।
বালী একজন হিন্দু, ১৯৭১ সালে তার পরিবারের একজন নিহত হয়। সরকার, জামায়াতে ইসলামী বা অন্যকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। তিনি বাংলাদেশ এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
২৬ মে ২০১৩ এ আলী আহসান মুজাহিদ-এর আইনজীবী মুন্সি আহসান কবির সরকার পক্ষের একজন সাক্ষী জালালউদ্দিনের হাতে লাঞ্ছিত হন। অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। ঐ আইনজীবী মারাত্মক আহত হলেও এর বিপক্ষে কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি। এই ঘটনাও একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেয়।
হাউজ লর্ডসের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাইব্যুনাল সফরের কর্মসূচি বাতিল করতে হয় বাংলাদেশের পরিস্থিতির কারণে। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা আশঙ্কা করছিলেন এই ঘটনা ব্যবহার করে সরকার আইসিটি’র সিদ্ধান্তকে জায়েজ করার অজুহাত পেতে পারে। আমাদের আশংকা যে সত্য তা স্টিফেন জে র্যাপের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর থেকেই প্রমাণিত হয়। সরকার তার বক্তব্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন।
তারা বলেন, ওপরে উল্লেখিত ঘটনাসমূহ এবং স্পেশাল প্রসিডিওর্সের রিপোর্ট ও বেসরকারি এনজিওসমূহের সমালোচনার আলোকে এটি এখন ইউএন হিউম্যান রাইটস কমিশনের দায়িত্ব এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা যে বাংলাদেশ সরকার প্রতিনিধি দলকে ইচ্ছাকৃতভাবে আমন্ত্রণ জানায়নি কি না। যদি তাই হয় তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আইসিটি’র কার্যক্রম, নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার বিষয়গুলো জানাতে হবে। তারা বলেন, অভিযুক্তদের মাথায় মৃত্যুদ-ের খাড়া থাকার প্রেক্ষিতে এবিষয়ে আপনার আশু হস্তক্ষেপ জরুরি।
‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর প্রতিবেদন
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১০ সালে এই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশী আইনজীবীরা এর সমালোচনা করে আসছেন। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন বৃটিশ আইনজীবী এই বিচারে হস্তক্ষেপের দাবি করে আবেদন দাখিল করেন। আসামী স্বচ্ছ বিচার পাবে না এই দাবি করে আবেদনটি করা হয়।
জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চাওয়া বৃটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান জাতিসংঘের বিচারবহির্ভূত হত্যা বিষয়ক বিশেষ রেপোটিয়ারকে চিঠি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’।
বৃটিশ ঐ আইনজীবীর দাবি, সাঈদীর বিচার স্বচ্ছ হয়নি। টবি ক্যাডম্যান বলেন, ‘আসামীপক্ষের আইনজীবীদের নির্যাতন, অপহরণ ও বিচারক পরিবর্তন সবকিছু মিলিয়ে শুরু থেকেই বিচার কার্যের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে পারেনি ট্রাইব্যুনাল।’
জাতিসংঘের রেপোটিয়ারের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য, বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বচ্ছ ও মানসম্পন্ন বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিতের জন্য বিষয়টিকে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত।’
আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার স্কোনা জোলি যিনি আইনজীবীদের মানবাধিকার কমিটির নির্বাহী সদস্য। তিনি সুখরঞ্জন বালী নামে আসামীপক্ষের এক সাক্ষীর গুম হওয়ার ঘটনায় জরুরি নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য ট্রাইব্যুনালের শুনানি বন্ধ রাখার কথা বলেছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, গত মাসের শেষ দিকে ভারতের কলকাতার দমদম কারাগারে সন্ধান মেলে গুম হওয়া সুখরঞ্জন বালীর। বালী অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশের পুলিশ আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতের চত্বর থেকে তাকে অপহরণ করে। বেশ কিছুদিন আটক রাখার পর বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে তুলে দেয়। আটক অবস্থায় নিরাপত্তাবাহিনী তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছে।
এশিয়ান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডিরেক্টর ব্রাড অ্যাডামস বলেছেন, ‘অপহরণের সঙ্গে জড়িতরাই বালীকে হত্যা করতে পারে অথবা ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে সে খুন হতে পারে বা তিনি পুশব্যাকের সময় স্থায়ীভাবে গুম হয়ে থাকতে পারেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘বালী যদি বাংলাদেশে ফেরেন তাহলে সত্যিকার অর্থেই ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। তার গুম হওয়ার ব্যাপারে তাকেই জড়ানো হতে পারে।’
রিপোর্টে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভীর উদ্বৃতি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটা একটা জাতীয় ট্রাইব্যুনাল। এখানে বিচারের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় এবং তা উন্মুক্ত। এটা কোনো ক্যাঙ্গারু কোর্ট নয়।
উল্লেখ্য, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের রায়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদ-ের রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পরে সাঈদীর পক্ষে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলেও এর শুনানি এখনো শুরু হয়নি।
